দেশে উপযুক্ত বিনিয়োগ না থাকায় স্বাভাবিকভাবে দেশের তরুণ সমাজ বহির্বিশ্বে কর্মসংস্থানের দিকে ঝুঁকছে। আমাদের জাতীয় আয়ের অন্যতম প্রধান খাতও বৈদেশিক রেমিটেন্স। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, ব্যাপক চাহিদা ও সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দেশের কারিগরি শিক্ষার সুযোগ-সীমিত হওয়ায় অধিকাংশ যুবক অদক্ষ শ্রমিক হিসেবেই বিদেশে যাচ্ছে। এর ফলে তারা শ্রমের ন্যায্য মজুরি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
উন্নত বিশ্বে যেখানে মধ্যম স্তরের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর হার ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে এ হার মাত্র ৩ শতাংশ বা তারও কম। শিক্ষিত বেকার ও কর্মমুখী যুবকদের কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারলে দেশের অর্থনীতির চেহারাই আমূল পাল্টে যেতে পারে। আমাদের জীবনযাত্রা, উৎপাদন ব্যবস্থা ও অর্থনীতি এখন পুরোপুরি প্রযুক্তিনির্ভর। গতানুগতিক ধারার শিক্ষাব্যবস্থা এখন আর জাতীয় উন্নয়নে কাঙ্ক্ষিত অবদান রাখতে পারছে না। এজন্য প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা সম্প্রসারণ জরুরি হয়ে পড়েছে। দেশের বিশাল জনসংখ্যাকে জনসম্পদে পরিণত করতে এবং দেশ-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ নিশ্চিত করতে কারিগরি শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারিত করার বিকল্প নেই। এই প্রেক্ষিতে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মান ও দক্ষতা বৃদ্ধির পাশপাশি নতুন নতুন কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউট স্থাপনের প্রয়োজন অপরিহার্য।
বিভিন্ন প্রকল্পের অধীনে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের অনেকগুলো কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তোলা হলেও বর্তমানে এসব কেন্দ্র চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ভবনগুলো পড়ে থাকলেও প্রয়োজনীয় শিক্ষক, যন্ত্রপাতি এবং বাজেট বরাদ্দ না থাকায় এসব প্রতিষ্ঠান মানসম্মত কারিগরি শিক্ষা বা দক্ষ জনবল গড়ে তুলতে পারছে না। বিদেশে দক্ষ বাংলাদেশী শ্রমিকের চাহিদা ছাড়াও দেশের অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান বর্তমানে নানাবিধ কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত জনশক্তির উপর ক্রমে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। দেশের টেক্সটাইল, গার্মেন্টস, নিটিং, ডাটা এন্ট্রি ও কম্পিউটার আউটসোর্সিং, ওষুধ শিল্প ও জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য হাজার হাজার কারিগরি শিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিকের যোগান দেয়া প্রয়োজন।
দেশে বর্তমানে সরকারি-বেসরকারি শতাধিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপ্লোমা ইনস্টিটিউট, ৯৮টি কৃষি ইনস্টিটিউট, ২১টি টেক্সটাইল এবং ১৬টি স্বাস্থ্যসেবা প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগই সরকারি নীতিমালা মানছে না। এগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, অভিজ্ঞ প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি বা কাঁচামাল সরবরাহ না থাকলেও প্রচুর শিক্ষার্থী রয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদের কোর্সে ভর্তি হয়ে কারিগরি শিক্ষার্থীরা হাতে-কলমে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ না পেয়ে যেমন প্রতারিত হচ্ছে, তেমনি প্রতিষ্ঠানগুলোও নামসর্বস্ব সার্টিফিকেট বাণিজ্যে লিপ্ত হয়ে পড়েছে।
দেশে বর্তমানে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষক স্বল্পতা রয়েছে শতকরা ৪০ ভাগ। পিএসসি'র মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হয় এবং একেকটি পদে লোক নিয়োগ দিতে ২-৩ বছর লেগে যায় বলে শিক্ষক স্বল্পতা ক্রমে তীব্র আকার ধারণ করেছে। শিক্ষকের পদ পূরণ ও কারিগরি শিক্ষার মান বাড়ানোর প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ না করে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে শত শত কোটি টাকার বাজেট খরচ করে কারিগরি শিক্ষিত জনশক্তির হার অথবা শিক্ষার মান কোনোটাই বাড়ছে না।
সরকার ইতোমধ্যেই ৩০ জেলা সদরে আরো ৩৫টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে ৯শ' কোটি টাকার একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানা যায়।
এমনকি প্রত্যেক থানায় ১টি করে কারিগরি স্কুল গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে সরকারের। তবে ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ও পুরনো ভোকেশনাল ইন্সটিটিউটগুলোকে প্রয়োজনীয় শিক্ষক ও শিক্ষা উপকরণের স্বল্পতা পূরণ না করলে নতুন প্রতিষ্ঠানের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ তৈরি হবে না। শিক্ষক নিয়োগে গতানুগতিক জটিলতা পরিহার করে স্বচ্ছতার ভিত্তিতে বিকল্প ব্যবস্থার কথা ভাবতে হবে। কারিগরি শিক্ষার নামে যাতে কেউ সার্টিফিকেট বাণিজ্য করতে না পারে, সে দিকেও নজরদারি বাড়াতে হবে। দেশের শিল্পায়ন, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং রফতানি বাণিজ্যের অনুকূলে চাহিদার নিরিখেই আমাদের কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ছাত্র রাজনীতির নামে হানাহানি ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধের বিদ্যামান প্রবণতা কঠোরভাবে দমন করে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ও মান নিশ্চিত করতে হবে।
.jpg
)









0 comments:
Post a Comment